আমি আবার স্বপ্ন দেখতে শিখেছি, আবার নতুন করে বাঁচতে শিখেছি

July 6, 2026
আমি আবার স্বপ্ন দেখতে শিখেছি, আবার নতুন করে বাঁচতে শিখেছি
মোহাম্মদ কবির হোসেনের ডিজিটাল সেবাভিত্তিক উদ্যোগ।

ভোরের ঠিক আগের সময়টুকুই সবচেয়ে অন্ধকার। জীবনের কিছু অধ্যায়ও যেন তেমন—যেখানে চারপাশে শুধু অনিশ্চয়তা, হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসের ভার। কিন্তু মানুষ তখনই নিজের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি লেখে, যখন সে ভেঙে পড়ার বদলে আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস খুঁজে পায়।

চাঁদপুর সদর উপজেলার তরপচন্দি গ্রামের মোহাম্মদ কবির হোসেনের জীবনও এমনই এক গল্প—সংগ্রাম, স্বপ্নভঙ্গ আর নতুন করে স্বপ্ন দেখার গল্প।

একসময় গ্রামের একটি ছোট্ট ইলেকট্রিক্যাল দোকানই ছিল তার পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। দোকানের সীমিত আয়ে কোনোমতে চলত সংসার। স্ত্রী ও ছোট্ট কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রায়ই তার মনে হতো, “এভাবেই কি কাটবে পুরো জীবন?” তিনি চেয়েছিলেন পরিবারের জন্য একটু স্বচ্ছলতা, মেয়ের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং নিজের জন্য সম্মানজনক জীবন।

সেই স্বপ্নই তাকে নিয়ে যায় হাজার মাইল দূর প্রবাসে।

স্বজনদের কাছ থেকে ধার করা টাকা নিয় পরিবারের অগাধ বিশ্বাস আর বুকভরা আশা নিয়ে তিনি পাড়ি জমান সৌদি আরবে। বিমানবন্দরে বিদায়ের মুহূর্তে তার চোখে ছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন—যে স্বপ্ন হয়তো বদলে দেবে তার পরিবারের ভাগ্য।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক কঠিন।

প্রবাসে গিয়ে তিনি দেখতে পেলেন প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক। যে সুযোগের আশায় দেশ ছেড়েছিলেন, তার অনেকটাই ছিল অধরা। অচেনা পরিবেশ, কঠোর পরিশ্রম আর প্রতিদিনের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কাটতে থাকে সময়। তবুও তিনি হার মানেননি। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে যখন মেয়ের কণ্ঠ শুনতেন, তখনই যেন নতুন করে শক্তি ফিরে পেতেন। সেই ছোট্ট কণ্ঠ তাকে মনে করিয়ে দিত—তার লড়াইয়ের কারণ।

এরপর পৃথিবীজুড়ে নেমে আসে করোনা মহামারির ছায়া।

হঠাৎ থমকে যায় সবকিছু। কাজ বন্ধ হয়ে যায়, আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একসময় বাধ্য হয়েই তাকে দেশে ফিরতে হয়। যে মানুষটি স্বপ্ন পূরণের আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন, তিনি ফিরে এলেন অপূর্ণ প্রত্যাশা, ঋণের বোঝা আর ভাঙা মন নিয়ে।

দেশে ফেরার পর দিনগুলো ছিল আরও কঠিন।

রাতের পর রাত নির্ঘুম কেটেছে ভবিষ্যতের চিন্তায়। কীভাবে চলবে সংসার, কীভাবে শোধ হবে ঋণ—এসব প্রশ্ন তাকে তাড়া করে ফিরত। অনেক সময় মনে হয়েছে সামনে আর কোনো পথ নেই। কিন্তু মনের গভীরে একটি বিশ্বাস তখনও বেঁচে ছিল—যতক্ষণ মানুষ বেঁচে থাকে, ততক্ষণ সম্ভাবনাও বেঁচে থাকে।

ঠিক সেই সময়ই তার জীবনে আসে আশার নতুন আলো।

এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে তিনি রেইজ প্রকল্পের কথা জানতে পারেন। পরে প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারে গিয়ে নিবন্ধন করেন এবং কাউন্সেলিং সেবা গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিনের হতাশার পর এই কাউন্সেলিং তার ভেতরে নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, ব্যর্থতা জীবনের শেষ নয়; বরং নতুন শুরুর একটি অধ্যায়।

তার আগ্রহের প্রেক্ষিতে প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় কম্পিউটার বিষয়ে এক মাসের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে প্রকল্প হতে ১৩ হাজার ৫০০ টাকার প্রণোদনা এবং ১০ হাজার টাকা প্রশিক্ষণ ভাতাসহ মোট ২৩,৫০০ টাকা দেওয়া হয়। অর্থের পরিমাণ হয়তো খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার কাছে এটি ছিল নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলার চাবি।

বাড়িতে পড়ে থাকা পুরোনো কম্পিউটারটি আবার সচল করেন তিনি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা বাড়ান। ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন, মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়—দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং নতুন করে শুরু করার সাহস।

সেই সাহসকেই পুঁজি করে তিনি শুরু করেন ডিজিটাল সেবাভিত্তিক উদ্যোগ।

প্রথম দিকে ছিল সীমিত পরিসর। কিন্তু নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে তার ছোট্ট উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এখন তার দোকানে প্রতিদিন মানুষ আসে বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা নিতে। অনলাইন আবেদন, তথ্যপ্রযুক্তি-ভিত্তিক সেবা কিংবা প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত—সবকিছুতেই তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকার মানুষের নির্ভরতার একটি নাম।

আজ তার দোকানের ব্যস্ততা দেখে কেউ হয়তো বুঝতেই পারবে না, এই মানুষটিই একসময় হতাশার অন্ধকারে পথ হারাতে বসেছিলেন।

হাসিমুখে কবির হোসেন বলেন,

“রেইজ প্রকল্প আমাকে শুধু আর্থিক সহায়তা দেয়নি, দিয়েছে নিজের ওপর বিশ্বাস করার শক্তি। আমি আবার স্বপ্ন দেখতে শিখেছি, আবার নতুন করে বাঁচতে শিখেছি।”

কবির হোসেনের গল্প শুধু একজন প্রবাসফেরত কর্মীর গল্প নয়; এটি ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, হার না মানার গল্প। তার জীবন আমাদের শেখায়—স্বপ্ন ভেঙে যেতে পারে, পরিকল্পনা বদলে যেতে পারে, কিন্তু ইচ্ছাশক্তি আর আত্মবিশ্বাস থাকলে নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব।