৩৮ বছরের এক সংগ্রামী নারী সুলতানা। নারায়ণগঞ্জ জেলার চাঁনপাড়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম তার। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। ভেবেছিলেন উচ্চশিক্ষা নিয়ে জীবনে ভালো কিছু করবেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট তার সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তাই অষ্টম শ্রেণির পর থেমে যায় তার শিক্ষাজীবন। স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। পরে তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। একটি ছোট্ট বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে তার সংসার শুরু হয়। কোলজুড়ে দুটি সন্তানও আসে তার।
তবে, স্বামীর সংসারেও অভাব তার পিছু ছাড়েনি। চরম এই আর্থিক সংকটের মধ্যে আরেক বিপদ নেশাগ্রস্থ স্বামী। ফলে সংসারের পুরো দায়িত্বই তার নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের মুখে কোন রকম খাবার তুলে দিচ্ছিলেন সুলতানা। কিন্তু এই রোজগার দিয়ে সন্তানদের পড়ালেখা করানোর কোনো উপায় ছিল না।
এই অবস্থায় ২০১৪ সালে তিনি লেবাননে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে কাজ করে সংসারে স্বচ্ছলতা আনার স্বপ্ন দেখেন। পাশাপাশি সন্তানদের পড়ালেখা করানোর ইচ্ছাও তার। এজন্য একজন এজেন্টের মাধ্যমে ৩,৫০,০০০ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি বিদেশযাত্রার খরচ জোগান। লেবাননে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে এই কাজ মোটেই সহজ ছিল না। দিনভর কঠোর পরিশ্রম করতে হতো তার। কিন্তু আশানুরূপ মজুরি পেতেন না। এতে ঋণ পরিশোধ করা এবং পরিবারের জন্য টাকা পাঠানো তার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় চলে আরও দু’বছর।
এরপর ২০১৬ সালে পারিবারিক জরুরি কারণে তিনি খালি হাতে দেশে ফিরে আসেন। বাংলাদেশে ফিরে তিনি আবার গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সন্তানদের দায়িত্বসহ সংসারের খরচ বহন করতে থাকেন। এই রুটিনেই চলছিল তার জীবন-সংসার।
এরইমধ্যে ২০২৩ সালে এক স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে সুলতানা জানতে পারেন, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ‘রেইজ প্রকল্পের সেবা সম্পর্কে। প্রকল্প হতে কাউন্সিলিং এর পাশাপাশি ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণই তার জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সেখানে তিনি ব্যবসা শুরু ও পরিচালনা পদ্ধতি শিখতে পারেন। প্রশিক্ষণ শেষ করার পর, তিনি প্রকল্প হতে ১৩ হাজার ৫০০ টাকা অনুদানও দেওয়া হয়। সেই টাকা দিয়ে একটি সেলাই মেশিন এবং কিছু কাপড় কিনে নিজ গ্রামে একটি ছোট টেইলারের দোকান শুরু করেন।
এই উদ্যোগ তার জীবন পাল্টে দেয়। এখন তিনি মাসে ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা উপার্জন করছেন। তার এই কাজ শুধু আয় বৃদ্ধিই করেনি। বরং তার আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক মর্যাদাও ফিরিয়ে এনেছে। সুলতানা ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানান, তাদের সহায়তা ছাড়া তিনি কখনো আর্থিক স্থিতিশীলতার স্বপ্ন দেখার সাহস করতেন না।
এখন সুলতানা আরও বড় স্বপ্ন দেখেন। তিনি চান তার মেয়ে যেন পড়াশোনা চালিয়ে যায় এবং জীবনে সফল হয়। যে শিক্ষা সুলতানা নিজে সম্পন্ন করতে পারেননি, তা মেয়েকে দিতে তিনি বদ্ধপরিকর। সুলতানা বিশ্বাস করেন, সঠিক প্রশিক্ষণ, সমর্থন এবং দৃঢ়মনোবল যে কাউকে জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে সক্ষম করে তোলে।