আঁধার পেরিয়ে আলোর পথে লিটনের জীবন

February 11, 2025
আঁধার পেরিয়ে আলোর পথে লিটনের জীবন
জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার চর পাকেরদহ ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা লিটন মিয়া। নিজ গ্রামের পাশের বালিজুরি বাজারে তার একটি   মুদি দোকান ছিল। এ দোকানের ওপর নির্ভর ছিল তার ৫ সদস্যের পরিবার। ভালোই ছিলেন তারা। লিটন মিয়া ব্যবসার পাশাপাশি বাড়িতে গরু-ছাগলও পালন করতেন। এছাড়াও অল্প কিছু কৃষিজমিও ছিলো তার।
হঠাৎ করেই এলাকার বিভিন্ন মানুষ বিদেশ যেতে থাকেন। তাদের দেখে তিনি নিজেও উদ্বুদ্ধ হন। তিনি ভাবেন, বিদেশে কাজ করে হয়তো তিনি আরও বেশি টাকা রোজগার করতে পারবেন। তাতে পরিবারে আরও বেশি স্বচ্ছলতা আসবে।

কিন্তু বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে তার পূর্ব ধারনা ছিলো না। কীভাবে যেতে হয় আর যোগ্যতাই বা কী- তার কিছুই জানতে না তিনি। তবে এটাকে স্বাভাবিকভাবেই নেন লিটন মিয়া। স্থানীয় দালালও তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল ভালো কাজ ও বেতনের। পরে তিনি বুকভরা আশা নিয়ে নিজের একমাত্র সম্বল দোকান বিক্রি করে দেন। এছাড়া আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও ধার-দেনা করেন। সবমিলে ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা যোগাড় করে তিনি তুলে দিয়েছিলেন দালালের হাতে। তিনি ভেবেছিলেন, বিদেশ গিয়ে কাজ করে অল্প সময়েই সব ঋণ শোধ করে দিতে পারবেন। এরপর শুধু সঞ্চয় বাড়াবেন। কিন্তু বিধিবাম, তার সেই স্বপ্ন নিমিষেই ধুলিসাৎ হয়ে গেলে। মালয়েশিয়ায় পা রাখার পরই তিনি বুঝতে পারলেন বড় ভুল করে ফেলেছেন তিনি। যেখান থেকে উত্তরনের আর পথ নেই তার। 
দালালের সাথে চুক্তি হয়েছিল সেখানে তাকে বিল্ডিং কন্সট্রাকশন এর কাজ দেওয়া হবে। তাতে অনেক টাকা বেতন।’ কিন্তু মালেশিয়ায় যাওয়ার পর তাকে একটি ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়। সেখানে তার মতো আরও অনেকে ছিলো। তারাও তার মতোই ভাগ্যবিড়ম্বিত। তিনিও তাদের মতো প্রতারণার শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেন, এই অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে তাকে দেশে ফিরতে হবে। এভাবেই কেটে যায় তিন মাস। তারপর তিনি দালালকে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে পাসপোর্ট ফেরত নেন, ফিরতে হয় ফেরেন।

কিন্তু বাংলাদেশে আরও কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছিলো। মাথার ওপর ঋণের বোঝা। অন্যদিকে, আয়-রোজগারের কোনো পথও খোলা নেই তার জন্য। তার কষ্টের কথা শোনার মতোও কেউ নেই। বরং উল্টো পাওনাদারের চাপ। একমাত্র আয়ের মাধ্যম মুদি দোকানটিও নেই। কী করবেন কিছুই বুঝে ওঠতে পারছিলেন না।
এই অবস্থায় একদিন তিনি ময়মনসিংহ ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কথা জানতে পারেন। জানতে পারেন, সেন্টার হতে বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন ধরনের তথ্য এবং পরামর্শ দিচ্ছে। একটু আশান্বিত হয়ে তিনি ময়মনসিংহ ওয়েলফেয়ার সেন্টারে যান। সেখানে ওরিয়েন্টেশন এবং রেজিস্ট্রেশন করে কাউন্সিলিং নেন। কাউন্সেলরকে তিনি তার সর্বশান্ত হওয়া ঘটনাও বর্ণনা করেন। তার সঙ্গে কথা বলে কাউন্সেলর বুঝতে পারেন তিনি মূলত একজন ব্যবসায়ী। এই অবস্থায় তিনি যদি কিছু টাকা লোন হিসেবে পান হয়তো ব্যবসাটা আবার শুরু করতে পারবেন। কাউন্সেলরের কাছ থেকে তিনি সহজশর্তে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণের বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর তিান রেফারেল ফরম নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক মাদারগঞ্জ শাখায় যোগাযোগ করেন। ম্যানেজারের আন্তরিক সহযোগিতায়তিনি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যবসায়িক লোন নিতে সক্ষম হন। সেই টাকা দিয়ে এখন তিনি নিজ গ্রামে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। বর্তমানে তার ব্যবসা মোটামুটি ভালোই চলছে। 
লিটন মিয়া বলেন, ‘যেভাবে তিনি ব্যবসা শুরু করেছেন সেটা কঠিন। একদিকে ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ, অন্যদিকে আত্মীয়-স্বজনের ঋণের চাপ। এই অবস্থায় তিনি এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। লিটন মিয়া বলেন ‘অন্ধকার হয়তো একদিন কেটে যাবে, ধীরে ধীরে আমি আমার ব্যবসাটাকে গুছিয়ে নিতে পারবো। আবারও ঘুরে দাড়াবো।’ তার বিশ্বাস, তার এই অন্ধকার সময় কেটে যাবে। অচিরেই আলো আসবে তার জীবনে। তার জীবনের এই ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।